২১শে আগস্ট, ২০১৮ ইং, ৬ই ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ্জ, ১৪৩৯ হিজরী

সামারাকে চোখের আড়াল হতে দিতেন না সালমা

মার্চ ১৪, ২০১৮, সময় ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

উম্মে সালমা। সৎ, নিষ্ঠাবান, দায়িত্বশীল ও চৌকস একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব তারা যথাযথভাবে পালন করতেন। নিজের কাজে এতোটাই দায়িত্ববান যে, পুরোপুরিভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটিও পালন করেননি তিনি।

আর এসব কারনেই খুশি হয়ে নিজে নেপালে না গিয়ে সালমা এবং তার আরেক সহকর্মী নাজিয়া আফরিন চৌধুরীকে সেমিনারে অংশ নিতে নেপাল পাঠান তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

জানা গেছে, ইউএস বাংলা উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে নিহত বেগম উম্মে সালমা বুয়েট থেকে পাস করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরিতে ঢুকেছিলেন। পরে বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারে জয়েন করেন।

সর্বশেষ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সিনিয়র সহকারী পদে কর্মরত ছিলেন তিনি।

‘ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস অ্যান্ড পোভার্টি অ্যালিভেশন ইন সাউথ এশিয়া প্র্যাকটিক্যাল অ্যাপ্রোচ টু ইম্প্রুভিং হিউম্যান অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস’ এর উপর দুই দিনব্যাপী সম্মেলন হবে নেপালের কাঠমান্ডুতে।

সম্মেলনে নাজিয়া-সালমার নাম প্রস্তাব করা হয়। সেই সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে নেপালের কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলার প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত হন পরিকল্পনা কমিশনের ওই দুই কর্মকর্তা।

জানা যায়, সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা ছিলো জিইডি’র সদস্য (সিনিয়র) ড. শামসুল আলমের। কিন্তু তিনি না গিয়ে এই দুই কর্মকর্তাকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।

মঙ্গলবার পরিবর্তন ডটকমের এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় সালমার বড় ভাই আনোয়ার সাদাতের। কান্না জড়িত কন্ঠে আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘সালমার মেয়ে সামারার বয়স এখনও আড়াই বছর হয়নি। অফিসে যাওয়ার সময় মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যেত। অফিস শেষে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরত। মেয়েকে কখনও চোখের আড়াল হতে দিত না।’

‘মেয়ে সামারাকে একা রেখে চলে গেল সালমা। গতকাল সকাল থেকে মেয়ে শুধুই কাঁদছে। কেন কাঁদছে বুঝতে পারছি না। মাকে হারানোর মতো জ্ঞানবুদ্ধি তো ওর নেই। মেয়েটিকে এখন মাকে ছাড়ায় বড় হতে হবে,’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আনোয়ার সাদাত।

সর্বশেষ কী কথা হয়েছিল সালমার সাথে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, অফিসের কাজে দুই দিনের জন্য নেপাল যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের দিন রোববারও ওর জিও লেটার আসেনি। তবে সোমবার সকালে অফিসে যাওয়ার পরই সালমার হাতে জিও লেটারটি আসে। জিও লেটার একটু পরে পেলে সালমা হয়তো বেঁচে যেতে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিমানবন্দরে গিয়ে আমাকে ফোন করে বলে ভাই আমি সকালে জিও লেটার হাতে পেয়েছি। আমি এখন নেপাল যাচ্ছি। এটাই ছিল সালমার সাথে আমার শেষ কথা।

আনোয়ার সাদাত জানান, ‘সালমা বেইলী রোডের অফিসার্স কোয়ার্টারে থাকতো। মেয়েটি এখন সেখানেই আছে। আমি কাল দেখা করে এসেছি। বাসায় আমাদের আত্মীয় স্বজন সবাই আছে। আর সামারাকে রেখে ওর বাবা মাসুদ আমার আরেক ভাইকে নিয়ে গতকাল সকালে নেপাল গেছে।’

আনোয়ার সাদাত আরো জানান, তার বাবা রায়হান আলী মিয়া ছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে সালমা সবার ছোট। সালমা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন হলিক্রস কলেজ থেকে। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যোগ দেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে। পরে বিসিএস পাস করে সালমা পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেন।

ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তাদের সংসারে রয়েছে সামারা নামে আড়াই বছরের এক মেয়ে। এই মেয়েকে নিয়ে এখন সালমার পরিবারের চিন্তা। এখন মেয়েটিকেই আগলে রাখব আমরা সবাই।

এদিকে পরিকল্পনা কমিশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিয়া-সালমার কর্মক্ষেত্র জিইডিতে মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) কালো ব্যাচ ধারণসহ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে তিন দিনের শোক পালন করা হচ্ছে।

জিইডি’র সেমিনার কক্ষও নাজিয়া-সালমা নাম রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্যদিকে মঙ্গলবার জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনের শুরুতেই পরিকল্পনা কমিশনের দুই কর্মকর্তার নামেই সম্মেলন উৎসর্গ করা হয়।

এসময় জিইডি’র সদস্য (সিনিয়র) ড. শামসুল আলম বলেন, ‘আমাকে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিলো। আমি আয়োজক কমিটিকে বলি যাবো না। এ সংক্রান্ত সম্মেলনে অনেক গিয়েছি। আমার দুই সহকর্মীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেই। আমার একার জন্য নেপালে যে খরচ হবে দুই সহকর্মী গেলে একই খরচ হবে। এরপর নাজিয়া আফরিন ও উম্মে সালমাকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমি দেখলাম এসব সম্মেলনে আমার সহকর্মীদের পাঠালে তারা খুশি হবেন। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘নাজিয়া আফরিন ও উম্মে সালমা কাজে সবসময় মনযোগী ছিলেন। তারা দুইজন অত্যন্ত মেধাবী, সদালাপী এবং নিষ্ঠাবান ছিলেন। তাদের হারিয়ে শুধু জিইডি পরিবার নয় গোটা দেশের ক্ষতি হয়ে গেলো।’